‘ঘরবাড়ি সব ভাসায়া নিয়া গেছে পাহাড়ি ঢলে। ঘর তো দূরের কথা, ভিটারই কোন চিহ্ন নাই। ওইখানে এখন নদী হয়ে গেছে। আমগরে থাকার মতোন আর কোন জায়গা থাকলো না। পথের ভিখারি হয়ে গেলাম আমরা।’ আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের পানিতে মাথা গুঁজার ঠাঁই হারিয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন স্বামীহারা রহিমা বেগম। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার পূর্ব খৈলকুড়া গ্রামের বাসিন্দা রহিমার বাড়িতে প্রতি বছর ঢলের পানি উঠলেও এবার একেবারে সবকিছুই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। বাড়ি কিংবা বসতভিটার কোন চিহ্নই নেই সেখানে। যেন নতুন কোন নদীর সৃষ্টি হয়েছে ওই জায়গাটিতে। সব হারিয়ে দিশেহারা রহিমা বেগম ও তার ছেলে রহিম মিয়া আশ্রয় নিয়েছেন পার্শ্ববর্তী একটি বেসরকারি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের কক্ষে। শুধু রহিমা বেগম নয়, তার মতো ১১টি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ওই বিদ্যালয়ে। তাদের মাঝে উপজেলা প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে শুকনো খাবারসহ সকালবেলা স্থানীয় উদ্যোগে রান্না করা খিচুরি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটি তো শুধু সাময়িক। সামনের দিনগুলোতে থাকবেন কোথায়, খাবেন কী? সে চিন্তায় দিশেহারা তারা।
জানা গেছে, গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের পানিতে ঝিনাইগাতীর মহারশি ও সোমেশ্বরী এবং নালিতাবাড়ীর চেল্লাখালী ও ভোগাই নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। এক পর্যায়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশির নদীর বাঁধের পুরাতন ভাঙা দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করে উপজেলা সদরের প্রধান সড়ক, বাজার ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এসময় উপজেলার পূর্ব খৈলকুড়া এলাকার সাত্তার মিয়া, রহিমা বেগম, রহিম মিয়া, আব্বাস উদ্দিন, বারেক মিয়া, বাচ্চু মিয়ার ঘরসহ অন্তত ১১টি পরিবারের ঘর ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঢলের পানি। এছাড়া মহারশি নদীর দিঘীরপাড়, সোমেশ্বরী নদীর কাড়াগাঁওসহ নালিতাবাড়ীর ভোগাই নদীর বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ রোপা আমন আবাদ ও সবজির আবাদ তলিয়ে যায়। এছাড়া ঢলে পানিতে পলি পড়ে অনেক জমির ধান নিচে পড়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বহু কৃষক। এছাড়া ঢলের পানিতে লাকড়ি ধরতে গিয়ে নিখোঁজ যুবক ইসমাইল হোসেনের লাশ ঝিনাইগাতীর পূর্ব খৈলকুড়া এলাকা থেকে শুক্রবার সকালে উদ্ধার করা হয়েছে। ইসমাইল পার্শ্ববর্তী ডাকাবর এলাকার ঝালমুড়ি বিক্রেতা মো. আব্দুল্লাহর ছেলে। এ নিয়ে পাহাড়ি ঢলে দুদিনে দুইজনের মৃত্যু হলো।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় ১ হাজার ৫৭৬ হেক্টর জমির রোপা আমন আবাদ পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে আংশিক ১ হাজার ৪০ হেক্টর ও সম্পূর্ণ নিমজ্জিত রয়েছে ৫৩৬ হেক্টর জমির আমন আবাদ। এছাড়া ৮৬ হেক্টর শীতকালীন আগাম সবজি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
সরেজমিনে শুক্রবার বিকেলে ঝিনাইগাতী উপজেলার পূর্ব খৈলকুড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মহারশি নদীর পানি একেবারে কমে গেছে। এতে ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। বহু বাড়িঘরের মালামাল দূরে খেতের মধ্যে বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেকেই কুড়িয়ে কুড়িয়ে সেগুলো নিয়ে এক জায়গায় জড়ো করছেন। রোপা আমন আবাদের উপর পলিমাটি পড়ে কিছু খেতের ধানগাছ একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষক আব্বাস উদ্দিন জানান, আমার বাড়িও ভেঙে গেছে, আবার ধানের জমির উপর পলি পড়ে আবাদও নষ্ট হয়ে গেছে। এখন সামনের দিনগুলোতে কিভাবে চলবো সেই চিন্তাই আছি। বাঁধটা তিন বছর আগে ভাঙছে। মেরামত না করায় প্রতিবছর একই জায়গায় ভাঙতেছে। এখন আমরা কোথায় যাব? ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য মো. জিহাদ হাসান বলেন, গতকালের (বৃহস্পতিবারের) ঢলে আমাদের ঘরবাড়ি ফসলাদি সব ভাসায়া নিয়া গেছে। কোন কিছুই আর অবশিষ্ট নাই। এই যে স্কুলে আইসা আশ্রয় নিছি। সকালবেলা কিছু নাস্তা দিছে, সেটা খায়াই আছি। এখন সরকার আমাদের একটা ব্যবস্থা না করে দিলে আমাদের আর কিছু করার নাই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জাহিদুল হক মনির বলেন, এই ১১টি পরিবার একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে। তাদের বাড়িঘরই এখন নদী। এটি পুরোপুরি পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতি। তারা যদি এই ভাঙা মেরামত করতো তাহলে এমন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া লাগতো না। এই এলাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি টেকসই কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণের দাবি জনগণের প্রাণের দাবি। নাহলে এলাকার লোকজন হয়তো কিছুদিন পর তাদের মৌলিক অধিকার আদায়ে রাস্তায় দাঁড়াবে।
বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান বলেন, পানি নেমে গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে আপদকালীন কাজ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত শুরু হবে। আর টেকসই বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, আমরা বিভিন্ন জায়গায় পরিদর্শন করে দেখেছি। পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত সময়ের মধ্যে নেমে গেলে কৃষকরা কম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আর পলি পড়ে আবাদ নষ্ট হওয়া কৃষকদের তালিকা তৈরি করে তাদের প্রণোদনার সার-বীজ বিতরণের আওতায় আনা হবে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, আসলে এই মহারশি নদীতে শক্ত কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ ছাড়া পাহাড়ি ঢলের সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিষয়টি উর্ধ্বতন মহলকে জানানো হয়েছে। আর বৃষ্টি না থাকায় নদীর পানি কমে এসেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ চলছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারিভাবে সহায়তা করা হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। বরাদ্দ প্রাপ্তি সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে ঘর নির্মাণের টিন বিতরণ করা হবে।
Reporter Name 









